সন্ত্রাসবাদে বিশ্বাসীদের বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী আখ্যায়িত করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেছেন, এই দেশ কীভাবে চলবে তা ১৯৭১ সালেই নির্ধারিত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবন মিলনায়তনে ‘সন্ত্রাসবাদ: আইন ও বাস্তবতা’ শীর্ষক এক সেমিনারে শনিবার (৩০ ডিসেম্বর) এই অভিমত তুলে ধরেন তিনি। সেমিনারে উচ্চ ও নিম্ন আদালতের বিচারক, আইনজীবী ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়।

বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, “সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা জটিল ও বিতর্কিত। সন্ত্রাসবাদের প্রকৃত লক্ষ্য হচ্ছে, চিন্তাকে হত্যা করা। সমাজকে এমনভাবে পথভ্রষ্ট করা যাতে সমাজ দ্রুত বিনাশের দিকে ধাবিত হয়। মানুষের ভেতরে ভয় ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টির মাধ্যমে ধর্মীয়, আর্থিক, আদর্শিক এবং রাজনৈতিক ফায়দা লুটাই সন্ত্রাসবাদের মূল উদ্দেশ্য।”

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী হামলার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “সন্ত্রাসবাদ কেবল তাৎক্ষণিক ক্ষতিই করে না, সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে সুদূরপ্রসারি ক্ষতিও করে। আর এর সবচেয়ে বড় শিকার হয় সাধারণ মানুষ।”

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই বিচারপতি বলেন, “যারা সন্ত্রাসবাদে বিশ্বাস করে তারা স্বাধীনতাবিরোধী। তারা জানে না বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। যারা এর বিপরীত ধ্যান-ধারণা লালনপালন করেন বা করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তারা ভুল করছেন। কারণ ৩০ লাখ মানুষের আত্মদান বৃথা যেতে পারে না। এই দেশ কীভাবে চলবে তা ১৯৭১ সালেই সেটেল করে দিয়েছে।”

সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। তিনি বলেন, “বিচার বিভাগকেও সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হবে। ইতোমধ্যে বিচার বিভাগ অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে সে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।”

সেমিনারে বক্তব্যে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্যের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঐক্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চোধুরী।

তিনি বলেন, “সন্ত্রাসবাদ আজকে একটি বৈশ্বিক সমস্যা। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সকল দেশই আজ হুমকির সম্মুখীন। উন্নত হোক, অনুন্নত হোক, প্রাচ্য হোক, পাশ্চাত্য হোক কেউই আজ এই হুমকি বা ঝুঁকির বাইরে না। নিউজ পোর্টালে চোখ রাখলে বা নিউজ পেপারের পাতা উল্টালেই বিশ্বের কোথাও না কোথাও সন্ত্রাসের ঘটনা আমরা দেখতে পাই। কাজেই এ রকম একটা বিষয় যা সকলকেই বিপন্ন করছে, সকলের অস্তিত্বকে হুমকি ও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, কোনো কিছুর কোনো অংশ না হওয়ার পরও সন্ত্রাসবাদের নির্মম শিকার হচ্ছে নীরিহ মানুষ। তাই এ জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সমস্ত বিশ্বকে একটি চিন্তায় ঐক্যমতে আসতে হবে।”

সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সংসদীয় কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় সংস্থাগুলোর মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ ও সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

স্পিকার বলেন, “সন্ত্রাসবাদের কোনো ঘাঁটি যাতে গড়ে উঠতে না পারে সেজন্য বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ ও সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। তার সঙ্গে যথাসময়ে যথাযথ তথ্যও খুব জরুরি। তথ্য না থাকলে পদক্ষেপ নেওয়া যায় না। তাই যথাসময়ে যথাযথ তথ্য পাওয়ার জন্য বিভিন্ন এজেন্সি বা সংস্থার মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ-সমন্বয় দরকার।”

অর্থনৈতিকভাবে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার ক্ষেত্রে অর্থপাচার আইনকে যুগোপযোগী করার সঙ্গে আইনটির কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার কথাও বলেন স্পিকার। তিনি বলেন, “সন্ত্রাসীরা প্রতিনিয়ত তাদের অর্থনৈতিক অবলম্বন বা পথগুলো পরিবর্তন করতে পারে। সেই পথগুলোও খুঁজে বের করতে হবে। কাজেই অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনটি খুবই শক্তিশালী করে তৈরির পাশাপাশি কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।”

এছাড়া সংঘাত-সংঘর্ষ, ধর্মীয়, নৃতাত্ত্বিক, বর্ণ বৈষম্য, দমন-পীড়নের মতো যেসব ক্ষেত্র বা পারিস্থিতি সন্ত্রাসবাদের জন্ম দেয় সেগুলো চিহ্নিত করে সেসব ক্ষেত্র বা পরিস্থিতি দ্রুত পরিহার করারও আহ্বান জানান শিরীন শারমিন চৌধুরী।

বক্তব্যে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মো. রহমত উল্লাহ বলেন, “এই শিক্ষা ব্যবস্থা হচ্ছে সবচেয়ে বড় সমস্যা। এই শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের আশান্বিত করতে পারছে না। সৃজনশীলতার নামে যা কিছু হচ্ছে এবং হয়েছে আমি মনে করি আগামী ২০ থেকে ৩০ বছর দেশ উন্নত বা বুদ্ধিদীপ্ত নাগরিক পাবে না রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে।”

শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট তুলে ধরে তিনি বলেন, “জনবিস্ফোরিত রাষ্ট্রে আমরা জানি না উচ্চ শিক্ষা নিয়ে কোথায় আমার ভাগ্য নির্ধারিত হবে। সবাই পড়ছে ক্যারিয়ার এডুকেশনে। সেখানে মূল্যবোধের ঘাটতি। এক ধরনের অতিশিক্ষা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, হচ্ছে। এতে তরুণ সমাজের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে হতাশা, বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা। এই শিক্ষা দিয়ে আমরা মূল্যবোধ তৈরি করতে পারছি না। মূল্যবোধ যতটুকু তৈরি হয় সেটিও ধরে রাখতে পারছি না। শিক্ষা আছে কর্মসংস্থান নেই, এমন অনেক কিছু মিলিয়েই সন্ত্রাসবাদের জন্ম হচ্ছে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করতে হলে এগুলোকে বাদ দিলে হবে না।”

দেশে উন্নয়নের যে ধারা চলছে সেখানে সন্ত্রাসবাদই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন অধ্যাপক রহমত উল্লাহ। তিনি বলেন, “দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সামাজিক অবস্থার সম্পর্ক সাংঘর্ষিক। ক্যাসিনোর টাকা কোথা থেকে আসে, কালো টাকা কোথায় বিনিয়োগ হয়? আমি মনে করি, দ্রুত উন্নয়নের একটি বিরাট অংশ সন্ত্রাসবাদে বিনিয়োগ করা হয়। দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে অর্থনৈতিক-সামাজিক বৈষম্য, শ্রেণি বিভক্তি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা সংঘর্ষের সৃষ্টি করছে। সেটিও সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিচ্ছে।”

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম।

সেমিনারের আয়োজক বাংলাদেশ আইন সমিতির সভাপতি আইনজীবী এ কে এম আফজাল-উল-মুনীরের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগের বিচারপতি নাইমা হায়দার, বিচারপতি মো. আলী, বিচারপতি খিজির হায়াত ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হক।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আইন সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমান আল-মামুন।