ফারিহা খানম:-ইসলামি আইনে তালাক শব্দের অর্থ হল কোনো কিছু খুলে ফেলা বা মুক্ত করা। একজন স্বামী তার স্ত্রীকে বিবাহ বন্দন থেকে আইনসিদ্ধ উপায়ে মুক্তি দেওয়াকে মুসলিম আইনে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ বলে।

কি কি উপায়ে বিবাহ বিচ্ছেদ হতে পারে?
১. মৃত্যুর মাধ্যমে;
২. স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক;
৩. স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাক, যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাক-ই-তৌফিজের ক্ষমতা দান করে থাকেন;
৪.পারস্পরিক সম্মতির মাধ্যমে ;
ক. খুলার মাধ্যমে এবং
খ. মুবারাতের মাধ্যমে;
৫.আদালতের মাধ্যমে;
৬.ধর্মত্যাগের মাধ্যমে ;

স্বামী কি যখন খুশি তখন তালাক দিতে পারে?

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭ (১) ধারা অনুযায়ী, স্বামী তালাক দেবার মনস্হ করলে তালাক দেবার সংবাদটি একটি নোটিশের মাধ্যমে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানকে (যে চেয়ারম্যানের এলাকায় স্ত্রী বাস করছেন) জানাতে হবে।সেই নোটিশের একটি কপি স্ত্রীকে পাঠাতে স্বামী বাধ্য। স্বামী যদি চেয়ারম্যান এবং স্ত্রীকে তালাকের নোটিশ না পাঠান, তবে ঐ একই আইনের ৭ (২) ধারা অনুযায়ে স্বামী এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা দশ হাজার টাকা জরিমানা অথবা অথবা দুটি দণ্ডেই দণ্ডিত হবেন।
নোটিশ পাবার ত্রিশ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পুনর্মিলন ঘটানোর উদ্দেশ্যে উভয়পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সালিশী পরিষদ গঠন করবেন এবং তাঁদের মধ্যে সমঝোতা আনার প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থা নেবেন।

কিন্তু সালিশীতে যদি কাজ না হয় এবং নোটিশ দেবার ৯০ দিনের মধ্যে স্বামী যদি স্ত্রীকে দেওয়া নোটিশ প্রত্যাহার না করেন, তবে ৯০ দিন পরে তালাক কার্যকরী হবে। ৯০ দিন পার না হওয়া পর্যন্ত দম্পতিকে আইনসিদ্ধ স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই ধরা হবে।
এই ৯০ দিন পর্যন্ত স্ত্রীর ভরণপোষণ ও অন্যান্য খরচাপাতি বহন করবেন স্বামী।
উল্লেখ্য যে, স্বামী কর্তৃক পরপর ৩ (তিন) বার “তালাক” উচ্চারন করে বিবাহ বিচ্ছেদ করা-সম্পূর্ণ বেআইনি ও অকার্যকর এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

তালাকের ক্ষেত্রে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে যে, যদি তালাক দেওয়ার সময় স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে থাকে তবে তার গর্ভাবস্থার পরিসমাপ্তি না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ সন্তান ভূমিষ্ঠ না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হবে না।

এই ৯০ দিন অতিক্রান্ত হবার আগে কি তালাক প্রত্যাহার করা যাবে?

হ্যাঁ, এই ৯০ দিন অতিক্রান্ত হবার আগে অবশ্যই তালাক প্রত্যাহার করা যাবে। এই সময়টা এইজন্যই রাখা হয়েছে যাতে করে স্বামী-স্ত্রী উভয়পক্ষই ঠাণ্ডা মাথায় সব কিছু ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন – পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসতে পারেন।

স্ত্রী কীভাবে স্বামীকে তালাক দিতে পারে?

(১) তালাক-ই-তৌফিজের মাধ্যমে
(২) খুলার মাধ্যমে
(৩) মোবারাতের মাধ্যমে
(৪) আদালতে আবেদনের মাধ্যমে

(১) তালাক-ই-তৌফিজের মাধ্যমে-

তালাক-ই-তৌফিজ স্ত্রীর নিজস্ব ক্ষমতা নয়। স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা দেয়, তবে স্ত্রীও স্বামীর মতো তালাক দিতে পারে। সেক্ষেত্রে স্ত্রীকেও স্বামীর মতো তালাকের নোটিশ চেয়ারম্যানের কাছে পাঠাতে এবং এক কপি স্বামীর কাছে পাঠাতে হবে। স্ত্রীর এই তালাক দেওয়ার ক্ষমতাকে তালাক-ই-তৌফিজ বলে।
কাবিননামার ১৮ নং কলামে স্বামী স্বীকে তালাক-ই-তাওফিজ ক্ষমতা অর্পণ করিয়া থাকেন।

(২) খুলা বিচ্ছেদের মাধ্যমে –
যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক বনিবনা ভাল না থাকে, তবে স্ত্রী অর্থ বা সম্পত্তির বিনিময়ে স্বামীকে বিচ্ছেদ ঘটাতে রাজী করাতে পারে। যেহেতু অধিকাংশ নারীর সম্পত্তি থাকে না অথবা সম্পত্তি থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থাকে না, সেক্ষেত্রে স্ত্রী মোহরানা বা মোহরানার অংশ দিয়ে স্বামীকে তালাক দিতে রাজী করানোর চেষ্টা করতে পারেন।
তবে গর্ভে সন্তান থাকলে ইদ্দত পালনকালে স্ত্রী তার গর্ভস্হ সন্তানের জন্য স্বামীর নিকট হতে ভরণ- পোষণ পাবে।

(৩) মোবারাত মাধ্যমে –
যে ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী, উভয়ই একে অন্যের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন এবং তাঁরা চুক্তির মাধ্যমে তাঁদের বিয়ের বিচ্ছেদ ঘটান, তখন বলা মোবারাত। খুলার মত মোবারাতও এক ধরণের চুক্তি-ভিত্তিক বিবাহবিচ্ছেদ।

(৪) স্ত্রী কর্তৃক আদালতে আবেদন মাধ্যমে তালাক-

মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯ অনুযায়ী মুসলিম আইনে বিবাহিত কোনও মহিলা নিচের এক বা একাধিক কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারবেন।

১. চার বছর পর্যন্ত স্বামীর কোনও খোঁজখবর পাওয়া না গেলে।

২. দুই বছর যাবত স্বামী কর্তৃক অবহেলিত এবং স্বামী ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হলে।

৩. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১এর বিধান লঙ্ঘন করে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করলে।

৪. স্বামী ৭ বছর বা তার বেশি মেয়াদের জন্য কারাদণ্ড প্রাপ্ত হলে।

৫. স্বামী কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া তিন বছর ধরে বিবাহিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে।

৬. বিয়ে করার সময় স্বামী পুরুষত্বহীন হলে এবং এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে।

৭. দুই বছর ধরে স্বামী অপ্রকৃতিস্থ থাকলে বা, কুষ্ঠ রোগ বা, সংক্রামক যৌন ব্যাধিতে ভুগলে।

৮. ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই যদি অভিভাবকের মাধ্যমে বিয়ে দেওয়া হয় এবং স্বামী-স্ত্রী সহবাস বা, বসবাস না করে তাহলে ১৯ বছর বয়স হওয়ার আগেই এই বিয়ে প্রত্যাখ্যান করলে।

৯. স্ত্রীর প্রতি স্বামী নিষ্ঠুর আচারণ করলে।
স্বভাবগতভাবে তাকে মারপিট বা, শারীরিক নির্যাতন ছাড়াও নিষ্ঠুর আচরণ করে স্ত্রীর জীবন দুর্বিষহ করে তুললে।

১০.খারাপ চরিত্রের মহিলাদের সঙ্গে মেলামেশা করলে বা অনৈতিক জীবনযাপন করলে।

১১.স্ত্রীকে অনৈতিক জীবনযাপানে বাধ্য করার চেষ্টা করলে।

১২. স্ত্রীর সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করলে বা, তার স্ত্রীর সম্পত্তির অধিকারে বাধা প্রদান করলে।

১৩.স্ত্রীর ধর্মকর্ম পালনে বাধা দিলে।

১৪.একাধীক স্ত্রী থাকলে পবিত্র কোরআনেরর বিধান মোতাবেক সমভাবে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হলে।

১৫। মুসলিম আইনানুযায়ী অন্যকোন বৈধ কারনে।

এসব নিষ্ঠুর আচরণের জন্য কাবিননামায় তালাকের ক্ষমতা না থাকা সত্বেও স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক প্রদান করতে পারবেন।
অন্য যে কোনও সংগত কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন যে, উল্লেখিত যে কোনও একটি কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে হলে স্ত্রীকে আদালতের মাধ্যমে যেতে হবে।
তবে উপরোক্ত কারণ গুলোর ভিত্তিতে মামলা দায়ের করতে হলে স্ত্রীর কাছে সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্যপ্রমান থাকতে হবে।
তালাক স্বামী বা, স্ত্রী যেই দিক না কেন, স্ত্রী তার প্রাপ্য মোহরানা যে কোনও সময় দাবী করতে পারবেন।

বস্তুত বিবাহ বিচ্ছেদের সাথে সাথে একটা পরিবারের অপমৃত্যু ঘটে। বিবাহ বিচ্ছেদকে সর্বদাই নিরুৎসাহিত করা উচিত। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দাম্পত্য কলহ মীমাংসা করা উচিত।