মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানের ক্ষেত্রে নিকট আত্মীয় ছাড়া অন্যদেরও সুযোগ রাখতে এই আইনের প্রসার বাড়াতে হাইকোর্টে মত দিয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। অন্যদিকে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গদানের বিষয়টি সবার জন্য উন্মুক্ত না করার পক্ষে মত দিয়েছেন আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) আইনজীবী মো. শাহীনুজ্জামান শাহীন। বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) এ সংক্রান্ত রিটের ওপর শুনানি সময় বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি খন্দকার দিলীরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে তারা এই অভিমত দেন। এরপর আদালত আগামী ২১ নভেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য দাখিলের নির্দেশ দিয়ে শুনানি মুলতবি করেন।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. শাহীনুজ্জামান শাহীন। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মাক্কিয়া ফাতেমা ইসলাম।

আদালতের নির্দেশনা অনুসারে মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন প্রসঙ্গে অভিজ্ঞ অভিমত দিতে এসে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘এটি একটি সংকীর্ণ আইন। নিকট আত্মীয় ছাড়া আর কারও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করার সুযোগ বর্তমান আইনে নেই। নিকট আত্মীয় যে সবসময় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করবেন, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। তাই আইনটি সংশোধন করতে হবে। যেন, একজন সুস্থ-সবল মানুষ চাইলেই তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করতে পারেন। এটিই হবে প্রতিকার। এজন্য দেশে ১০ হাজার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ দরকার। কিন্তু সেখানে আছেন মাত্র ২০০ জন। টাকা বা সম্পত্তি দান করার মতোই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করতে চাওয়াটা মানুষের মৌলিক অধিকার।’

তাই শুধু নিকট আত্মীয়দের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানের প্রক্রিয়াটি সবার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। তবে এর কারণে সমাজের দরিদ্র মানুষেরা যেন ক্ষতির স্বীকার না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে আইনে বিশেষ বিধান রাখারও প্রয়োজন রয়েছে বলেও আদালতকে জানান তিনি।

তবে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানের বিষয়টি সবার জন্য উন্মুক্ত না করার পক্ষে অভিমত দিয়েছেন আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) আইনজীবী মো. শাহীনুজ্জামান শাহীন। তিনি আদালতকে বলেন, ‘অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানের সুযোগ আইনের মাধ্যমে প্রসারিত হলে দেশে এর অপব্যবহার বেড়ে যাবে। সমাজের নিম্ন শ্রেণীর মানুষেরা অভাবের তাড়নায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেনাবেচায় মেতে উঠবে।’ এরপর তিনি আসকের পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেনাবেচা নিয়ে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন।

একই বিষয়ে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, প্রফেসর ড. হারুনুর রশিদ, প্রফেসর আছিয়া খানমসহ মোট ৫জন আদালতে তাদের অভিমত তুলে ধরেন।

পরে রিটকারী আইনজীবী রাশনা ইমাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানের বিষয়টি মানবিক ও দাতব্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ চেয়ে আদালতের কাছে অনুমতি চেয়েছি। আদালতের আগের রায় অনুযায়ী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (শরীরে অপরিহার্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ) দানে ধর্মীয় বিষয়টি বাধা হবে না বলে রায় আছে। সুতরাং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানের ক্ষেত্রে ধর্ম কোনও বাধা নয়। এদিকে আইনটির পরিসর বাড়ালে এর অপব্যবহার হতে পারে বলে দাবি তোলা হয়েছে। সেজন্য আমরা সংশোধীত আইনে একটি সেফ গার্ড রাখার আবেদনও জানিয়েছি। আদালত এই মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২১ নভেম্বর দিন নির্ধারণ করেছেন।’

প্রসঙ্গত, এ সংক্রান্ত এক রিটের শুনানি নিয়ে ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনের ৩টি ধারা কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। ‘মানবদেহের অঙ্গ-প্রতঙ্গ সংযোজন আইন-১৯৯৯’-এর ধারা তিনটি হলো—২ (গ), ৩ ও ৬। নিকট আত্মীয়দের কাছ থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গ্রহণ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গদাতার যোগ্যতা বিষয়ে বলা হয়েছে এই ধারাগুলোয়।

এছাড়া, ১৯৯৯ সালের আইনের কয়েকটি বিধি প্রণয়নে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ এবং অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, রুলে তাও জানতে চেয়েছেন আদালত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে এসব রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছিল।