বাংলাদেশে হাসপাতালে অবহেলার অভিযোগ হলেই লোকজন ডাক্তার বা চিকিৎসার সাথে জড়িত অন্যদের ওপর চড়াও হয়। কারণ মানুষ জানে না তারা বিচারের জন্য কোথায় যাবে। কিন্তু অবহেলা বা ভুল চিকিৎসা হয়েছে বলে মনে হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আসলে কোথায় যাবেন?

চিকিৎসায় অবহেলা কী?
চিকিৎসায় অবহেলা বলতে শুধু চিকিৎসকের অবহেলা নয় বরং চিকিৎসাসেবা সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা যেমন- নার্স, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন ও সরবরাহকারীদের অবহেলাও বুঝানো হয়। চিকিৎসায় অবহেলার দায়ে কাউকে অভিযুক্ত করতে চাইলে প্রথমত প্রমাণ করতে হবে যে, রোগী এবং চিকিৎসাসেবা প্রদানকারীর মধ্যে এমন একটি চুক্তি হয়েছিল যার মাধ্যমে রোগীর প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেওয়া ও যত্ন নেওয়ার একটি আইনি দায়িত্ব চিকিৎসক বা চিকিৎসাসেবা প্রদানকারীর ছিল। দ্বিতীয়ত যদি সেই দায়িত্ব পালনে চিকিৎসক বা চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী অবহেলা করে বা ব্যর্থ হয়। তৃতীয়ত দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা ব্যর্থতার কারণে উক্ত রোগী যদি ক্ষতির শিকার হয় বা মৃত্যুবরণ করে।

বাংলাদেশে এমন ঘটনার অভিযোগ করার একমাত্র যায়গা সংসদে আইন করে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল বা বিএমডিসি। কিন্তু সেই তথ্য সাধারণ মানুষজনের অনেকেরই অজানা।

বিএমডিসির উচিৎ হাসপাতালগুলোতেই এ তথ্য রোগীদের দেয়ার ব্যবস্থা করা। তবে অভিযোগ করার একমাত্র যায়গা হল এর বিএমডিসির ঢাকা কেন্দ্র। কিন্তু বাংলাদেশে বহু দরিদ্র মানুষে এতটাই কম আয় যে তারা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঢাকা পর্যন্ত যাওয়ার চিন্তাও করেননা।

বিএমডিসির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডাক্তার মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ বলছেন, “বিএমডিসির কোন আঞ্চলিক অফিস নেই। আমাদের কাছে ভুক্তভোগি ব্যক্তি বা তার বৈধ প্রতিনিধিও যদি লিখিত অভিযোগ নিয়ে আসে আমরা তা আমলে নিয়ে বিএমডিসির শৃঙ্খলা কমিটি তদন্ত করে ও যথাযথ পদক্ষেপ নেয়।”

তবে তিনি বলছেন চিকিৎসকদের ত্রুটি দেখার জন্য সম্প্রতি দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে কমিটি করা হয়েছে।
বাংলাদেশে রোগীদের সুরক্ষায় খুব বেশি না হলেও অল্প কিছু ব্যবস্থা রয়েছে।

অভিযোগ প্রক্রিয়া:-
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল বা বিএমডিসি একটি সরকারি সংস্থা। এখানে যারা কর্মরত রয়েছেন তারা সবাই চিকিৎসক।

সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডাঃ মোহাম্মদ আরমান হোসেন বলছেন কিভাবে বিএমডিসিতে চিকিৎসকের বা স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের অবহেলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করা যায়।

* যে হাসপাতাল বা চিকিৎসক সম্পর্কে অভিযোগ, সেখানে যে সেবা নিয়েছেন তার সকল কাগজপত্র, চিকিৎসক, প্রতিষ্ঠানের নাম, চিকিৎসার তারিখ, সময় সহ সে কেন মনে করছে অবহেলা হয়েছে তার একটি ব্যাখ্যা সহ বিএমডিসির রেজিস্ট্রার বরাবর অভিযোগকারীর সই ও ঠিকানা সহ লিখিত অভিযোগ করতে হবে।
* এরপর অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে সেই অভিযোগের কপি পাঠানো হবে। তাকে কাউন্সিলের কাছে জবাব দিতে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া হবে।
* সেই বক্তব্য পাওয়ার পর বিএমডিসি অভিযোগকারীকে সেটি জানাবে।
* তার সেই বক্তব্যে আপত্তি থাকলে তিনি সেটি গ্রহণ না করার অধিকার রাখেন।
* অভিযোগ তখন একটি শৃঙ্খলা কমিটির কাছে যাবে । কমিটি যদি মনে করে এই ঘটনার তদন্ত করা প্রয়োজন তাহলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তারা দরকারে হাসপাতালে যাবে এবং প্রতিবেদন জমা দেবে।

কিন্তু বাস্তবতা হল এই সংস্থা সম্পর্কে জানেন না প্রায় কেউই। হাসপাতালগুলো থেকে সেই বিষয়ে জানানো হয় না।
তাই সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি প্রায়শই তার ক্ষোভ হাসপাতাল বা ক্লিনিকেই প্রকাশ করে ফেলেন। যার ফল হল প্রায়শই ভাঙচুর বা চিকিৎসককে মারধোর।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হল বিএমডিসির রাজধানী ঢাকায় কার্যালয় মাত্র একটি।
আর সেখানে কেউ অভিযোগ নিয়ে গেলেও তাতে অনেক সময় লেগে যায় বা পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ তৈরি হয়।

স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন:-
বাংলাদেশে ২০১৬ সালে “রোগী এবং স্বাস্থ্যসেবা দানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা আইন” নামে একটি আইন প্রস্তাব করে সরকার।
কিন্তু এই আইনটি এখনো পাশ হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডাঃ আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন,” এটির খসড়া মন্ত্রিসভায় পাঠানো হয়েছিলো। মন্ত্রিসভা কিছু প্রশ্ন পাঠায়। সেগুলো সংযুক্ত করে আবারো মন্ত্রিসভায় পাঠানো হয়েছে।”
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে চিকিৎসকদের আপত্তির কারণেই তা এখনো পাশ করা সম্ভব হয়নি।
আইনটির খসড়া প্রকাশিত হয় যখন, সেই সময় থেকেই এর সমালোচনা শুরু হয়েছে এই নিয়ে যে এতে রোগী নয় বরং চিকিৎসকদের সুরক্ষার দিকে বেশি নজর দেয়া হয়েছে।
ভুল চিকিৎসার অভিযোগে রোগীর আত্মীয়দের সাথে চিকিৎসকদের নানা সময়ে যে বিবাদ, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে সেই বিষয়টি নজর পেয়েছে বেশি।

কী আছে প্রস্তাবিত আইনে:-
বিশেষ করে দুটি বিষয় নিয়ে আপত্তি উঠেছে।
আর তা হল চিকিৎসকের ভুলের অভিযোগ উঠলে চিকিৎসক বা অন্য সেবা-দানকারীদের সাথে সাথে গ্রেপ্তার করা যাবে না।

অন্যদিকে কোনও ব্যক্তি স্বাস্থ্য সেবা-দানকারীদের প্রতি সহিংস আচরণ করলে এবং প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর করলে তা জামিন অযোগ্য অপরাধ হবে বলে গণ্য হবে। আর এ কারণেই অনেকে মনে করছেন চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা নিয়ে আইনটিতে বেশি মনোযোগ দেয়া হয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিকারের পাশাপাশি রয়েছে সাংবিধানিক প্রতিকার,ফৌজদারি প্রতিকার এবং দেওয়ানি প্রতিকার।

সাংবিধানিক প্রতিকার: সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক চাহিদার মধ্যে ‘স্বাস্থ্য’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ১৮ অনুচ্ছেদে জনগণের পুষ্টিমান এবং ‘গণ-স্বাস্থ্য’ সুরক্ষার কথা সন্নিবেশিত হয়েছে। অনুচ্ছেদ ৩২-এ বর্ণিত ‘জীবন রক্ষার অধিকার’ একটি সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত এবং আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য। চিকিৎসায় অবহেলা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যর্থতা এই জীবন রক্ষার মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করে। তাই চিকিৎসায় অবহেলা হলে সর্বোচ্চ আদালতে রিট বা জনস্বার্থে মামলা করার সুযোগ আছে।

ফৌজদারি প্রতিকার: ১৮৬০ সালে প্রণীত দণ্ডবিধি বাংলাদেশের প্রধান ফৌজদারি আইন। দণ্ডবিধির ৩০৪ (ক) ধারানুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি বেপরোয়া বা অবহেলামূলক কাজের মাধ্যমে কারো মৃত্যু ঘটায় তাহলে সেটি ৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। দণ্ডবিধির ৩১২ থেকে ৩১৪ ধারায় ডাক্তারি প্রয়োজন ব্যতীত গর্ভপাত ঘটানো একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। দণ্ডবিধির ২৭৪, ২৭৫ ও ২৭৬ ধারায় যথাক্রমে ওষুধ বা চিকিৎসা সরঞ্জামে ভেজাল মেশানো, ভেজাল ওষুধ বা চিকিৎসা সরঞ্জাম বিক্রি এবং এক ওষুধ বা চিকিৎসা সরঞ্জাম অন্য নামে বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য। এসব অপরাধ দমন ও আইনি প্রতিকার প্রদানের উদ্দেশ্যে ২০০৯ সালের ভ্রাম্যমান আদালত আইনের মাধ্যমে নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হয় এবং শাস্তি ও জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে একই দণ্ডবিধির ৯২ ধারানুসারে সরল বিশ্বাসে কোনো ব্যক্তির উপকার করার উদ্দেশ্যে চিকিৎসক চিকিৎসাসেবা প্রদান করলে এবং এর ফলে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না।

দেওয়ানি প্রতিকার: ১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধির ১৯ ধারা অনুসারে কারো অবহেলাজনিত কাজের ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি স্থানীয় দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে দেওয়ানি মামলা দায়ের করতে পারেন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুসারে কোনো রোগী ফি-এর বিনিময়ে ডাক্তার, হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সেবা গ্রহণ করলে তিনি ‘ভোক্তা’ হিসেবে গণ্য হবেন এবং চিকিৎসা  সংক্রান্ত অবহেলার শিকার হলে ভোক্তা অধিকার আইনে ক্ষতিপূরণ চেয়ে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার যদি রোগ নির্ণয়ে ভুল বা অবহেলা করে যার ফলে রোগী ক্ষতিগ্রস্থ হয় কিংবা যদি সেবা প্রদানে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে তাহলে ভোক্তা অধিকার আইনে মামলা করা যাবে। এই আইন অনুসারে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযোগকারী আদায়কৃত জরিমানার ২৫ শতাংশ অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রাপ্য হবেন।