তদন্ত ছাড়াই বিচার হচ্ছে ‘নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট (এনআই অ্যাক্ট) বা ‘চেক ডিজঅনার’ মামলার। এতে ফেঁসে যাচ্ছে অনেক নিরীহ দরিদ্র মানুষ। অজ্ঞতা ও সরলতার দরুন অর্থদন্ড গুনতে হচ্ছে তাদের। অকারণ কারাভোগ করতে হচ্ছে অ্যাকাউন্ট হোল্ডার বা চেক স্বাক্ষরকারীকেও। এনআই অ্যাক্টের মামলা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে অসংখ্য ফৌজদারি মামলা। তৈরি হচ্ছে আর্থসামাজিক অস্থিরতা, টানাপড়েন, পারিবারিক অশান্তি এবং অভাব-অভিযোগ। চেকের মামলায় আত্মহত্যা, হার্ট অ্যাটাক, ব্রেন স্ট্রোক করে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। মানসিক রোগী, দেশান্তরী, আত্মগোপন কখনো বা বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। আইনজ্ঞরা বলছেন, চেক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাব রয়েছে। এ ছাড়া মামলার বিচারকালে বিচারকের অনুসন্ধান কিংবা তদন্ত করার এখতিয়ার থাকলেও অনেক আইনজীবীই বিষয়টি আদালতে উপস্থাপন করেন না। আইনটির ১৩৮ ধারার ভুল প্রয়োগ করছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

কেস স্টাডি (এক) : সাংসারিক অনটনে পড়ে সমবায় সমিতি থেকে ৭ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন ঢাকা সূত্রাপুরের গৃহবধূ বিলকিস। জামানত হিসেবে তার কাছ থেকে রাখা হয়েছিল একটি ব্ল্যাংক চেক। প্রতি মাসে তিনি সমিতির কিস্তি পরিশোধ করেছেন। ২ বছরে শোধ করেছেন ২০ হাজার টাকার বেশি। তারপরও এক দুপুরে তার হাতে আসে চেক ডিজঅনার মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানা। আড়াই লাখ টাকা দাবি করে মামলা ঠুকে দেয়া হয়েছে। টাকা নেয়ার সময় কথা ছিল কিস্তি পরিশোধ হলে চেক ফেরত পাবেন। যদিও কোনো লিখিত চুক্তি ছিল না। কিন্তু সমিতির নামে স্থানীয় সুদ কারবারিরা প্রতারণা করে তার সঙ্গে। ঋণের ৩ গুণ টাকা শোধ করলেও ফেরত পাননি চেক। পরে গ্রেফতার এড়াতে বাবার বাড়ি থেকে প্রাপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে সুদ কারবারিদের অন্যায্য দাবি মেটাতে বাধ্য হন।

কেস স্টাডি (দুই) : বোনের শ্বশুরবাড়ির দাবিকৃত যৌতুক দিতে সুদের ওপর চেক বন্ধক দিয়ে ৮০ হাজার টাকা নেন বগুড়ার কলেজ শিক্ষক রওশন। বিপরীতে ১১ লাখ টাকা পরিশোধ করলেও শেষ হয়নি তার ঋণের মূল ৮০ হাজার টাকা। একটি চেকে ১২ লাখ টাকা, আরেকটি চেকে ১৬ লাখ টাকা বসিয়ে এনআই অ্যাক্টে একতরফা রায় করিয়ে নেয় স্থানীয় সুদখোর চক্র। তার বিরুদ্ধে এনআই অ্যাক্টে চেক ডিজঅনার মামলা হয়। মামলার যুক্তিতর্কে তার পক্ষের আইনজীবী এই মর্মে যুক্তি দেখান যে, চেকের স্বাক্ষরটি শুধু আসামির (রওশন)। কিন্তু টাকার অংক, তারিখটি তার হাতের লেখা নয়। ব্ল্যাংক চেকে বাদী নিজেই অর্থ দাবিদারের নাম, টাকার অংক এবং তারিখ বসিয়েছেন। কিন্তু এ যুক্তি ধোপে টেকেনি। একতরফা রায় হয়ে যায় অ্যাকাউন্ট হোল্ডার রওশনের বিরুদ্ধে। পরে তাকে কারাগারে যেতে হয়।

কেস্ট স্টাডি (তিন) : টাঙ্গাইলের তুহিন হাওলাদার মেধাবী ছেলেকে বুয়েটে ভর্তি করাতে এক স্বজনের কাছ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা করজ নেন। সিকিউরিটি হিসেবে স্বজনকে একটি স্বাক্ষরকৃত ব্ল্যাংক চেক দেন। অর্থ সঙ্কটের কারণে নির্ধারিত সময়ে তুহিন স্বজনের টাকা শোধ করতে পারেননি। অমনি স্বাক্ষরকৃত চেকে ১৮ লাখ টাকা বসিয়ে চেকটি ‘ডিজঅনার’ করান কথিত স্বজন। টাকার জন্য কোনো প্রকার তাগাদা না দিয়ে একপর্যায়ে তুহিন হাওলাদারের বিরুদ্ধে স্বজন গোপনে মামলা ঠুকে দেন। আদালত থেকে সমন জারি হয়। দুর্নীতিবাজ কোর্ট কর্মচারীদের হাত করে সমনগুলোও গায়েব করেন পাওনাদার আত্মীয়। পরে চেক ইস্যুকারী তুহিনকে ‘পলাতক’ দেখিয়ে একতরফাভাবে রায় করিয়ে নেন পাওনাদার। আকস্মিক এ খবর জানতে পেরে স্ট্রোক করেন চেক ইস্যুকারী তুহিন। তিন সপ্তাহের মতো ধুঁকে তিনি মারা যান। ঘটনাটি বছর দুই আগের।

কেস স্টাডি (চার) : বগুড়ার মানবাধিকার কর্মী এবং আইনজীবী শাহজাদী আঞ্জুমান আরা। একটি হত্যা মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে আসামিপক্ষ তাকে হুমকি দেয়। একপর্যায়ে তার বাড়িঘর লুট করে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে যায়। এর মধ্যে ছিল চেকবই এবং স্বাক্ষরকৃত কিছু অব্যবহৃত চেক। পরে লুণ্ঠনকারীরা ওই চেকে টাকার অংক বসিয়ে মামলা ঠুকে দেয়। বাড়িঘর লুট করার ঘটনায় আদালতে ২০১৫ সালে মামলা হয়। সমন জারি হয়। আসামিরা জামিনে বেরিয়েই ২০১৬ সালে বাদী আঞ্জুমান আরার বিরুদ্ধে ঠুকে দেয় এনআই অ্যাক্টে পৃথক দু’টি মামলা। মামলা দু’টি বগুড়া যুগ্ম জেলা জজ আদালতে বিচারাধীন।

ঘটনাগুলো পৃথক হলেও বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। এনআই অ্যাক্টে দায়েরকৃত মামলায় এমনটি ঘটছে অহরহ। এসব মামলা আইনি বাধ্যবাধকতার জন্য আদালতে উঠছে বিচারের জন্য। কিন্তু নেপথ্যে থাকছে অনেক ঘটনা।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১৮৮১ সালে প্রণীত হয় ‘নোগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট’ বা এনআই অ্যাক্ট। মূল এ আইনটি ১৯৯৪ সাল, ২০০০ এবং সর্বশেষ ২০০৬ সালে সংশোধন হয়। তবে এই সংশোধনগুলো আইনের মৌলিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনেনি। ১৯৯৪ সালের সংশোধনীতে নোটারি পাবলিকের বিষয়টি বাদ দিয়ে চেক বাউন্সের বিধানগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়। নোটারি পাবলিক নিয়োগের বিধানসংবলিত আইনটির ১৭ নম্বর ধারাটি প্রতিস্থাপন করা হয় চেক ধারাগুলোর মাধ্যমে। প্রতিস্থাপিত ১৩৮ ধারায় বলা হয়েছে, অর্থ না থাকা বা অন্য কোনো কারণে চেক বাউন্স বিষয়ে মামলা হলে চেকদাতার (আসামির) এক বছর কারাদন্ড ও চেকের অঙ্কের দ্বিগুণ পরিমাণ পর্যন্ত অর্থ জরিমানা হবে। ২০০০ সালের সংশোধনীতে চেকে উল্লিখিত অর্থের তিনগুণ পর্যন্ত অর্থদন্ডের বিধান যুক্ত করা হয়। ২০০৬ সালে সংশোধন করে বলা হয়, আপিল করতে হলে জরিমানার অর্ধেক টাকা জমা দিয়ে আপিল করতে হবে।

সুপ্রিম কোর্ট বারের আইনজীবী ব্যারিস্টার আকবর আমীন বলেন, সংশোধনীগুলো আইন এবং প্রায়োগিক বাস্তবতার গভীর গবেষণালব্ধ নয়। দেশের সাম্প্রতিক আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন নেই এতে। আইনটির বাস্তবসম্মত সংশোধন প্রয়োজন। যেমন ধরুন, বিচারকালে চেকে শুধু অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের স্বীয় স্বাক্ষরটির সঠিকতা যাচাই করা হয়। এখানে স্বাক্ষরের পাশাপাশি অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের স্বহস্তে লেখা বৈধ প্রাপকের নাম, টাকার পরিমাণ উল্লেখ বাধ্যতামূলক করার দরকার। এ ছাড়া চেক ব্যবহার ও বিনিময়ের বিধিমালা থাকা দরকার। না হলে বৈধ পাওনাদারকে চেক প্রদান ছাড়াও নানাভাবে এক ব্যক্তির চেক অন্য ব্যক্তির হস্তগত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। স্বাক্ষরকৃত চেক চুরি, ছিনতাই কিংবা ডাকাতি হতে পারে। হারিয়ে যেতে পারে। হস্তগত এসব চেকে ইচ্ছেমতো অংক বসিয়ে এনআই অ্যাক্টে মামলা ঠুকে দেয়া যেতে পারে। কিন্তু বিদ্যমান আইনে চেকের বৈধ প্রাপক, বৈধ ইস্যুকারী ইত্যাদি বিষয়গুলো আদালতের বিবেচনায় আনার সুযোগ নেই।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক হিসেবে অবসরে যাওয়া সিনিয়র জেলা জজ মো. মাইদুল ইসলামের মতে, ১৮৮১ সালের এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারাটি বহুল প্রয়োগ দেখা যায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে। ঋণ আদায় করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণগ্রহীতা কিংবা গ্রাহকের সঙ্গে বড় ধরনের প্রতারণা করছে। প্রথমত, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহককে ঋণ দেয়ার সময় ওই প্রতিষ্ঠানেই একটি ঋণ অ্যাকাউন্ট খোলাচ্ছে। গ্রাহকের ওই অ্যাকাউন্টের একটি চেক বন্ধক রেখে তাকে ঋণ দিচ্ছে। গ্রাহক যখন খেলাপি হয়ে যান তখন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধক রাখা চেকটি গ্রাহকের অ্যাকাউন্টেই জমা দিয়ে ডিজঅনার করাচ্ছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটি জানে যে, এই অ্যাকাউন্টে গ্রাহকের কোনো টাকা নেই। এটি একটি প্রতারণা। দ্বিতীয়ত, বন্ধক রাখা একটি চেকের বিপরীতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ৩টি ধারায় মামলা করছে। একটি মামলা করা হয় এনআই অ্যাক্টে। একটি করছে ‘অর্থঋণ আদালত-২০০৩’ আইনে। আরেকটি মামলা করছে সিআরপিসির ৪২০ ধারায়। অর্থঋণ আদালত আইন এবং এনআই অ্যাক্টের অসংখ্য মামলায় রায় প্রদানকারী সাবেক এই জেলা জজ বলেন, এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলা একটি আইনগত ভুল প্রয়োগ। অর্থঋণ আদালত আইন-২০০৩ এর ৫ ধারায় বলা হয়েছে, ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায় সংক্রান্ত যাবতীয় মামলা অর্থঋণ আদালতেই দায়ের করতে হবে। এই ধারাটি দিয়ে ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে গ্রাহকের বিরুদ্ধে এনআই অ্যাক্টের মামলাকে বারিত করা হয়েছে। অথচ এ আইনেই প্রতিষ্ঠানগুলো মামলা করছে। এটি আইনের ভুল প্রয়োগ।

মাইদুল ইসলাম আরো বলেন, ব্যক্তিপর্যায়ের দায়ের করা এনআই অ্যাক্টের মামলাগুলোতে আসামিপক্ষের ডিফেন্সগুলো আমলে নেয়ার পক্ষে হাইকোর্টের একটি রুলিং আছে। কী প্রক্রিয়ায় চেকটি বাদীর হাতে গেল, বাদী চেকে উল্লেখিত অংকের অর্থের বৈধ দাবিদার কি না, চেকের স্বাক্ষরটি তার কি না- আসামি পক্ষের এসব ডিফেন্স বিচারক আমলে নিতে পারেন। বাস্তবতা হচ্ছে, অধিকাংশ বিচারকই আসামিপক্ষের ডিফেন্সগুলো অগ্রাহ্য করেন। কখনো বা আসামিপক্ষের আইনজীবী যথাযথভাবে ডিফেন্স নিতে পারেন না।

অবসরে যাওয়া জেলা জজ এস এম আব্দুর রউফের মতে, এনআই অ্যাক্টে করা মামলায় পুলিশ কিংবা কোনো সংস্থা কর্তৃক তদন্ত করার বিধান নেই বটে; কিন্তু বিচারিক আদালত নিজেই এ বিষয়ে তদন্ত কিংবা ‘কয়েরি’ করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আসামিপক্ষ তার পক্ষের যুক্তিগুলো তুলে ধরতে পারেন। আইনে সবই আছে। কে কিভাবে এটির প্রয়োগ করেন সেটি হচ্ছে বিষয়।

এদিকে আইন কমিশন সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বরে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাংক্টের বেশ কিছু সংশোধনী আইন মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠায় আইন কমিশন। নিরীহ, নিরপরাধ মানুষের হয়রানি রোধে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে সংশোধনীর সুপারশটি পাঠানো হয়। দুই বছর হতে চললেও সেই সংশোধনী উদ্যোগের অগ্রগতি নেই।