বিয়ের ছয় মাস পরেই আমি গর্ভবতী হয়ে পড়ি। কিন্তু আমার স্বামী দুই বছরের আগে সন্তান চান না। হঠাৎ করেই যখন আমি জানতে পারি, আমি এক মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তখন স্বামী আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে একটি ক্লিনিকে নিয়ে গর্ভপাত করান। আমি কীভাবে আইনগত সহায়তা পেতে পারি? নাবিলা( ছদ্দনাম), দিনাজপুর।

আইনজীবীর উত্তর : আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেহেতু আপনার স্বামী গর্ভপাত করানোর চেষ্টা করছেন, তাই আপনার স্বামী দণ্ডবিধির ৩১৩ ধারা অনুসারে অপরাধ করেছেন। দণ্ডবিধির ৩১৩ ধারায় বলা আছে, নারীর সম্মতি ছাড়া গর্ভপাত করানো একটি গুরুতর অপরাধ। এর জন্য যাবজ্জীবন বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান আছে।

গর্ভবতী হওয়ার ২৮ সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা নষ্ট করলে সেটাকে এবোরশন বা গর্ভপাত বলে। আমাদের দেশে আইন অনুযায়ী, এবরশন বা গর্ভপাত নিষিদ্ধ হলেও এর সংখ্যা দিনে দিনে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
শুধুমাত্র ২০১৪ সালেই দেশে প্রায় ১২ লাখ এবরশন করানো হয়।

(সূত্র: গুটম্যাকার, ২০১৭)।

আইনের আশ্রয় কীভাবে নেবেন

অবৈধ গর্ভপাত বা অস্বাভাবিক অপরাধের শিকার হলে আদালতে বা থানায় দুভাবে মামলা করা যায়।

আদালতে মামলা দায়ের

আদালতে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে প্রথমে একজন আইনজীবীর কাছে যেতে হবে। আইনজীবীকে সব কাগজপত্র দেখানোর পর তাঁর সঙ্গে মামলার খরচের বিষয়ে আলাপ করে নিতে হবে। খরচ আপনার মনমতো হলে সেই আইনজীবীর মাধ্যমে মামলা দায়ের করতে হবে।

আইনজীবী বাদীর সব কাগজপত্র পর্যালোচনা করে একটি নালিশি দরখাস্ত তৈরি করবেন। তারপর নিকটস্থ মুখ্য বিচারিক হাকিম বা মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে সিআর বা পিটিশন আকারে মামলা দায়ের করবেন।

আদালতের হাকিম বাদীর ফৌজদারি কার্যবিধির ২০০ ধারা অনুযায়ী জবানবন্দি নিয়ে আসামির কাছে সরাসরি সমন বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করবেন। এ ছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচারক মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিতে পারেন। তদন্ত প্রতিবেদনে সত্যতা পাওয়া গেলে তখন আবার আদালত সরাসরি সমন বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করবেন।

থানায় মামলা দায়ের

অবৈধ গর্ভপাতের ঘটনায় আপনি চাইলে নিকটস্থ থানায় এজাহার হিসেবেও মামলা করতে পারবেন।  থানায় মামলাটি গ্রহণ করলে একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করে দেবেন থানার ডিউটি অফিসার। সে তদন্ত কর্মকর্তা আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করতে পারবেন।

এ ছাড়া আপনি পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইনের  মাধ্যমেও প্রতিকার চাইতে  পারেন। এ আইনে সুরক্ষা এবং ক্ষতিপূরণ উভয়ের জন্যই নিকটস্থ হাকিম (ম্যাজিস্ট্রেট) আদালতে আবেদন করতে হবে। সেখানে শুনানির ওপর ভিত্তি করে আদালত পারিবারিক সুরক্ষা এবং ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন। বিবাদী যদি আদালতের সুরক্ষা আদেশ লঙ্ঘন করেন, তাহলে আপনি আদালতে এ আইনের ৩০ ধারায় পৃথক আবেদন করতে পারেন। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে সুরক্ষা আদেশ লঙ্ঘনকারীদের ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দিতে পারেন।

ছেলে হোক বা মেয়ে পিতা-মাতার জন্য যে কোন সন্তানই হল স্রষ্টা প্রদত্ত সবচেয়ে বড় উপহার। অথচ এ মূল্যবান প্রাণ নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। নৈতিক অবক্ষয় কোথায় গিয়ে পৌঁছাচ্ছে তা ভাবতে গেলেও গা শিহরিত হয়। এ নির্মমতার শেষ কোথায়?

লেখক : আইনজীবী.